আজ ৬ই বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ১৯শে এপ্রিল, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

কঠোর জীবনের মুখোমুখি খেটে খাওয়া মানুষ

মহামারী করোনা নিয়ন্ত্রণে ১৮ দফা নির্দেশনা জারি করেছে সরকার। দেশে করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) সংক্রমণের বিস্তার রোধে ৭ দিনের জন্য ‘কঠোর বিধিনিষেধ’ আরোপ করেছে সরকার। এর আওতায় মূলত নাগরিকদের চলাচল ও জনসমাগম এড়ানোর জন্যই বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে। আজ সোমবার ভোর ৬টা থেকে আগামী ১১ এপ্রিল রাত ১২টা পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞাগুলো কার্যকর থাকবে। কিন্তু দেশের একটি বড় অংশ দিন আনে দিন খায়। তারা বলছেন, করোনাভাইরাস বিপজ্জনক কিন্তু লকডাউনের কারণে জীবন-জীবিকার শঙ্কায় ভুগছেন সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ।

গতকাল রোববার দুপুরের পর রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকায় লকডাউনবিরোধী মিছিল ও সমাবেশ করছে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।এ সময় তারা দাবি জানান, অবিলম্বে লকডাউন প্রত্যাহার করতে হবে। ব্যবসায়ীরা বলেন, আমরা কোনো লকডাউন চাই না। এটাই আমাদের এক দফা দাবি। এর আগে শনিবার রোজা ও ঈদ সামনে রেখে লকডাউনের এক সপ্তাহ ৪ ঘণ্টার জন্য দোকান খোলা রাখার দাবি জানায় বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতি। এছাড়াও রোজার আগে প্রতিদিন বেড়েই চলেছে নিত্যপণ্যের দাম। এতে ক্ষোভ বাড়ছে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তের। তাদের অভিযোগ কয়েক বছর ধরেই ধাপে ধাপে বেড়েছে নিত্যপণ্যের দাম। সমপ্রতি বেশকিছু পণ্যের দাম অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। বিশেষ করে চাল, ভোজ্যতেল, ডাল ও চিনিসহ বেশ কিছু পণ্যের দাম বেড়েছে। এখন পবিত্র রমজান মাসকে সামনে রেখে দফায় দফায় বাড়ছে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম। সরকার কাঙ্ক্ষিত পদক্ষেপ না নেয়ায় হতাশার পাশাপাশি ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাধারণ মানুষ। এর আগে গত শনিবার এক সাংবাদিক সম্মেলনে সাতদিনের জন্য লকডাউনের ঘোষণার কথা জানান ওবায়দুল কাদের। একই আভাস দেন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন।

লকডাউনের সিদ্ধান্তের বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক (ডিজি) অধ্যাপক ডা. আবুল বাশার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম বলেন, অধিদফতরের পক্ষ থেকে ১২ দিনের সম্পূর্ণ লকডাউনের প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল। কিন্তু সরকার প্রথম এক সপ্তাহের লকডাউন ঘোষণা করেন। তবে পরিস্থিতি দেখে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। তিনি বলেন, লকডাউনকালে অত্যাবশ্যকীয় সেবা ছাড়া সবকিছু বন্ধ থাকবে। সন্ধ্যা ৬টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত ঘরের বাইরে যাওয়া সম্পূর্ণ নিষেধ। এছাড়া গণপরিবহণ, দূরপাল্লার বাস, লঞ্চ, বিমান ও ট্রেন চলবে কিনা, সে বিষয়ে রাতেই (শনিবার) নির্দেশনা তৈরি হবে, যা রোববার প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে জানানো হতে পারে। লকডাউন চললে স্বাস্থ্য অধিদফতর ও হাসপাতালে স্বাস্থ্যকর্মী, চিকিৎসক ও নার্সের ছুটি আপাতত স্থগিত থাকবে। যদিও স্ব স্ব মন্ত্রণালয়/বিভাগ ও কর্তৃপক্ষ সরকারি প্রজ্ঞাপনের আগেই লঞ্চ, ট্রেন ও অভ্যন্তরীণ রুটের ফ্লাইট বন্ধের নির্দেশনা দিয়েছে। কথা হয় রাজধানীর মোহাম্মদপুরের একটি হোটেলে কাজ করেন সেলিম হোসেন এর সাথে। তিনি বলেন, কিছুদিন আগে ঢাকায় এসে এখানে কাজ নিয়েছি। সামনে রমজান ও ঈদ। কিছু টাকা উপার্জন করে পরিবারের কাছে ফিরতে চেয়েছিলাম। লকডাউনের কারণে এখন কিছুই মাথায় আসছে না। সংসার চালাব কীভাবে? গাবতলী বাস টার্মিনালের ব্যবসায়ী মকবুল হোসেন।

তিনি বলেন, গতবছর লকডাউনের কারণে ১০ লাখ টাকা লোকসান গুনতে হয়েছে। বছর পার না হতেই আবার লকডাউন। এবার পথে বসা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না। তবে সরকারের উচিত রমজানের আগে লকডাউন শেষ করা। তবে আক্ষেপ প্রকাশ করেন রায়েরবাজার এলাকার রিকশাচালক জাহেরুল ইসলাম। তিনি বলেন, লকডাউন দিলেতো আমাদের কিছুই করার নেই। তবে সরকারের উচিত আমাদের কথা ভেবে বিকল্প উপায়ে পরিস্থিতি মোকাবিলা করা। নয়তো বাড়িতে ছেলেমেয়ে না খেয়ে থাকবে। অপরদিকে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করা তোহিদ রহমান নামে একজন বলেন, লকডাউন দেয়ার দরকার ছিল আরো ১৫ দিন আগে। করোনাতো এখন বাড়েনি এটা অনেক আগেই বেড়েছে। তখন দিলে পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণে থাকত। সামনে রমজান ও ঈদ। করোনার পরিস্থিতি থেকেও ভয়াবহ পরিবার-পরিজনকে নিয়ে না খেয়ে থাকা।

আতঙ্কিত রাইড শেয়ারিং চালকরা : লকডাউনের খবরে জীবিকা নিয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন রাইড শেয়ারিং মোটরসাইকেলের চালকরা। তারা বলছেন, দেশে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ প্রতিরোধে গত ৩১ মার্চ সরকার ১৮টি নতুন নির্দেশনা দেয়। নির্দেশনার পরপরই সড়ক পরিবহণ কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) অ্যাপভিত্তিক রাইড শেয়ারিং সেবা বন্ধ করে দেয় দুই সপ্তাহের জন্য। রাইড শেয়ারিং বন্ধ করে দিলেও খ্যাপ (যাত্রীদের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে) মারতেন তারা। এতে ট্রাফিক পুলিশ বাধা দিলেও কোনোমতে দিন চলে যাচ্ছিল তাদের। কিন্তু এখন লকডাউন ঘোষণার পর এ ব্যবস্থাও বন্ধ হওয়ার পথে। আগামী দিনগুলোতে কীভাবে সংসার চালাবেন, তা নিয়ে চিন্তিত তারা। অপরদিকে সরকারের পক্ষ থেকে জারি করা ১৮ দফায় সংক্রমণ প্রতিরোধে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু সরেজমিনে দেখা গেছে রাজধানীর অনেক এলাকায় তা উপেক্ষিত হচ্ছে। হাট-বাজার, মার্কেট ও শপিংমলে যেন স্বাস্থ্যবিধি মানার বালাই নেই। অনেকে মাস্ক ব্যবহার করছেন না। সামাজিক দূরত্ব, সাবান দিয়ে হাত পরিষ্কার করা নিশ্চিত করা যায়নি। গণজমায়েত নিষিদ্ধ থাকলেও সেটাও রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে উপেক্ষিত হচ্ছে।

রাজধানীর নিউ মার্কেট-টিকাটুলিসহ বেশ কিছু এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বিপুল সংখ্যক মানুষের সমাগম। কিছু সময় পরপর মাইকে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে আহ্বান জানানো হচ্ছে। কিন্তু তোয়াক্কা করছেন না কেউ। অনেকের মাস্ক নেমে এসেছে থুতনির নিচে। সামাজিক দূরত্ব মেনে চলছেন না কেউই। নিউ মার্কেটের কাঁচা বাজারে আসা ক্রেতাদের অনেকের মুখে মাস্ক থাকলেও বিক্রেতাদের মুখে ছিল না মাস্ক। মুখে মাস্ক না থাকার কারণ জিজ্ঞাসা করলে সবজি বিক্রেতা শাহিন আলম বলেন, মাস্ক পরে গরমের মধ্যে বেশিক্ষণ থাকা যায় না। ক্রেতাদের সঙ্গে সবজির দরদাম করতে হয়। বাধ্য হয়ে মাস্ক খুলে বসতে হয়েছে। অপরদিকে বেশির ভাগ মানুষ সংসারের জন্য প্রয়োজনীয় পণ্য-চাল, ডাল, তেল, পেঁয়াজ ও আলু কিনছিলেন। কেউ কেউ আবার একসঙ্গে বাড়তি পরিমাণ পণ্য কিনে ঘরে ফিরছেন। অনেকেই আবার নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের মজুদ শুরু করেছেন। নগরীর শপিংমলগুলোতেও লোকজনের প্রচ- ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। লকডাউনের খবরে ঈদের কেনাকাটাও সেরেছেন কেউ কেউ। ব্যবসায়ীরা জানান, এই দুপুরে সাধারণত এমন ভিড় দেখা যায় না। লকডাউনের খবর শুনেই হয়তো ক্রেতারা প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে বাজারে আসছেন। ক্রেতারা বলছেন, লকডাউনের খবর শোনার পর রোজার বাজার করতে এসেছি। লকডাউন কত দিন থাকবে, সেতো আর বলা যাচ্ছে না। এছাড়া করোনার মাঝে বাজারে যত কম আসতে হয় ততই ভালো। তাই রমজানের বাজারসহ যতটুকু সম্ভব বাজার করলাম।

লকডাউনের প্রতিবাদে নিউমার্কেটে সড়ক অবরোধ : লকডাউনে মার্কেট বন্ধের প্রতিবাদে সড়ক অবরোধ করে অবস্থান নিয়েছেন নিউমার্কেটের ব্যবসায়ীরা। এ সময় সড়ক ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ করলে পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করেন বিক্ষোভরত ব্যবসায়ীরা। রোববার বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে চন্দ্রিমা সুপার মার্কেটের সামনে দু’পাশের সড়ক বন্ধ করে অবস্থান নেন ব্যবসায়ীরা। পরে পর্যায়ক্রমে আশে-পাশের বিভিন্ন মার্কেটের ব্যবসায়ীরা এসে যোগ দেন। এর ফলে নিউমার্কেট এলাকার সড়কের দু’পাশেই যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পুলিশ জানায়, লকডাউনে স্বাস্থ্যবিধি মেনে মার্কেট খোলা রাখার দাবি জানিয়ে রাস্তা বন্ধ করে অবস্থান নিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। তারা বিভিন্ন সস্নোগান দিয়ে কয়েকটি গাড়ি ভাঙচুর করে। এ সময় ব্যবসায়ীদের সড়ক ছেড়ে দেয়ার অনুরোধ করলে তারা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকেন। নিউমার্কেট থানার পরিদর্শক ইয়াসিন আলী জানান, ব্যবসায়ীদের বুঝিয়ে সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে পুলিশ। মার্কেট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনার চেষ্টা চলছে।

নামায ও ইফতারের সময়সূচীঃ

সেহরির শেষ সময় - ভোর ৪:২১ পূর্বাহ্ণ
ইফতার শুরু - সন্ধ্যা ৬:২৮ অপরাহ্ণ
  • ফজর
  • যোহর
  • আছর
  • মাগরিব
  • এশা
  • সূর্যোদয়
  • ৪:২৬ পূর্বাহ্ণ
  • ১২:০৬ অপরাহ্ণ
  • ৪:৩৪ অপরাহ্ণ
  • ৬:২৮ অপরাহ্ণ
  • ৭:৪৪ অপরাহ্ণ
  • ৫:৪১ পূর্বাহ্ণ

Leave a Reply

     এই বিভাগের আরও খবর