আজ ২০শে ফাল্গুন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ৫ই মার্চ, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

সোয়াবিন তেল তুমি কার??

দেশের ভোজ্যতেলের বাজারে চলছে ব্যবসায়ীদের রামরাজত্ব। যে যেভাবে পারছে বাড়িয়ে নিচ্ছে সয়াবিন তেলের দাম। খোলা বা বোতলজাত কোনও প্রকার ভোজ্যতেলের নামই এখন সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেই। কেউ কেউ বোতলজাত সয়াবিনের গায়ে লেখা দামের তুলনায় বাড়িয়ে নিচ্ছেন। ক্রেতারা কারণ জানতে চাইলে ব্যবসায়ীদের একমাত্র জবাব- ‘সাপ্লাই নেই, কোম্পানি আসে না’। আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই দিয়ে এখনও চলছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। ট্যারিফ কমিশনের নেতৃত্বে গঠিত কমিটি দাম সমন্বয়ের কাজ করছে। কবে নাগাদ সেই দাম আলোর মুখ দেখবে এর জবাব নেই কারও কাছে। সামনে রমজান। এমন পরিস্থিতিতে দিশেহারা সাধারণ মানুষ। তাদের প্রশ্ন—দেশের ভোজ্যতেলের বাজার কে দেখভাল করে?আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদার তুলনায় সয়াবিন ও পাম অয়েলের সরবরাহ কম—এমন অজুহাতে দেশের বাজারে প্রায় দুই মাস ধরেই ভোজ্যতেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী। ৮৮ টাকা লিটার দরের সয়াবিন তেল এখন কোথাও বিক্রি হচ্ছে ১৩০ টাকা আবার কোথাও ১১৫ টাকা। একই পণ্যের দামে এত পার্থক্যের কোনও ব্যাখ্যা কারও কাছে নেই। সরকারের বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসাবে, গত এক বছরে দেশে সয়াবিন তেলে ২৪ দশমিক ৩২ শতাংশ ও পাম অয়েলের ২২ দশমিক ৮৪ শতাংশ দাম বেড়েছে।জানা গেছে, গত ১০ বছরের মধ্যে ভোজ্যতেলের এখন সর্বোচ্চ বাজার। এক মাসের ব্যবধানে খুচরা পর্যায়ে সয়াবিন তেলের দাম বেড়েছে ৯ দশমিক ৫২ শতাংশ। আর বছর ব্যবধানে এ বৃদ্ধির হার ১২ দশমিক ২০ শতাংশ। এরইমধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির কথা বলে পণ্যটির দাম বাড়াতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ সংস্থা বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনে চিঠি দিয়েছে ভোজ্যতেল আমদানিকারক সমিতি।ভোজ্যতেল আমদানি সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে এখন সয়াবিন তেলের দাম বেশি। মিল মালিকরা এক হাজার ডলারের বেশি মূল্যে সয়াবিন আমদানিতে এলসি খুলেছেন। এতে লিটার প্রতি সয়াবিন তেলের দাম প্রায় ১৩০ টাকা পড়বে। এ কারণেই সয়াবিনের দাম বাড়ানোর আবেদন করা হয়েছে।বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলছে, ভোজ্যতেল নিয়ে সারাদেশে একটা সংকট তৈরি হয়েছে। দেশের ভোজ্যতেলের চাহিদার ৯০ শতাংশ আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর নির্ভর করে। যখন সেখানে দাম বাড়ে তখন দেশের বাজারেও তার প্রভাব পড়ে। ছয় মাস আগে প্রতিটন অপরিশোধিত সয়াবিন তেল ৭০০ ডলারে বিক্রি হলেও বর্তমানে ১১৫০ ডলারে দাঁড়িয়েছে। এতে দেখা যায়, দাম ৭৫ শতাংশ বেড়েছে। কিন্তু গত এক সপ্তাহ ধরে আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেলের দাম কমতে শুরু করেছে। তবে তা স্থিতিশীল নয়। তাই এখনই দাম কমাতে রাজি নয় দেশের ব্যবসায়ীরা।গত শুক্রবার (৫ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর খুচরা বাজারে এক লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেল কোম্পানিভেদে ১৩০ থেকে ১৪০ টাকায় টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে। আর পাঁচ লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম রাখা হচ্ছে কোম্পানিভেদে ৬২০ থেকে ৬৮০ টাকা পর্যন্ত। বাজারে প্রতি লিটার পাম সুপার ১১০ থেকে ১১৫ টাকা, পাম অয়েল ১০০ থেকে ১০২ টাকায় বিক্রি হয়। একশ্রেণির ব্যবসায়ী কারসাজি করে তাদের ইচ্ছেমতো বাজারে সয়াবিনের দাম বাড়াচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এদিকে ব্যবসায়ীরা সয়াবিনের ওপর আরোপিত আমদানি শুল্ক প্রত্যাহারের দাবি করলেও এ বিষয়ে এখনও কোনও সিদ্ধান্ত নেয়নি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড-এনবিআর। বিষয়টি নিয়ে বিব্রত সরকার। এমন পরিস্থিতিতে করণীয় নির্ধারণে গত ২৪ জানুয়ারি ভোজ্যতেল আমদানিকারকসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠক করেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি। এ বৈঠকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ, বাংলাদেশ ব্যাংক, ট্যারিফ কমিশন, বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। ওই বৈঠকে সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ সংস্থা ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের নেতৃত্বে ভোজ্যতেল আমদানিকারকসহ সংশ্লিষ্টদের নিয়ে একটি কমিটি করে দেওয়া হয়েছে। যারা আন্তর্জাতিক বাজার দরের সঙ্গে সমন্বয় করে দেশীয় বাজার দর ঠিক করবে। কিন্তু সেই কমিটি এখনও এ কাজটি সম্পন্ন করতে পারেনি।তবে এর আগে ভোজ্যতেলের বাজার সহনীয় পর্যায়ে রাখতে কয়েকটি সুপারিশ করা হয়েছিল। ট্যারিফ কমিশনের প্রথম সুপারিশে বলা হয়েছিল, সরকার উৎপাদন ও ব্যবসায়ী পর্যায়ে বিদ্যমান ভ্যাট মওকুফ করলে এবং সরবরাহ ও খুচরা পর্যায়ে কমিশনের হার লিটারপ্রতি যথাক্রমে ৩ ও ৫ টাকা নির্ধারণ করলে ভোজ্যতেলের দামে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। দ্বিতীয় সুপারিশে কমিশন বলেছে, ভোজ্যতেলের ওপর যে অগ্রিম কর রয়েছে, সেটি তুলে নিলেও বাজারে এর দামে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে এবং দাম কমবে। তৃতীয় সুপারিশে ট্যারিফ কমিশন বলেছে, আমদানি মূল্যে শতকরা হারের পরিবর্তে টনপ্রতি নির্দিষ্ট হারে ভ্যাট আরোপ করলেও সুফল পাওয়া যাবে। কমিশন আরও বলছে, আমদানিকারকদের দুই পর্যায়ে ভ্যাট অব্যাহতি, অগ্রিম কর প্রত্যাহার এবং সরবরাহ ও খুচরা পর্যায়ে কমিশন যৌক্তিক করলে সয়াবিন তেলের দাম লিটারপ্রতি ১১০ টাকার মধ্যে রাখা যাবে। এসব সুপারিশের কোনোটাই এখন পর্যন্ত গ্রহণ করেনি সরকার তথা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।ব্যবসায়ীরা বলছেন, দেশে চাহিদার ৯০ শতাংশ ভোজ্যতেল আমদানি করা হয়। আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল থেকে সবচেয়ে বেশি সয়াবিন তেল আমদানি করে। কিন্তু ব্রাজিলে সয়াবিনের উৎপাদন কম হয়েছে, আর আর্জেন্টিনায় দীর্ঘদিন ধরে ভোজ্যতেলের মিলগুলোতে শ্রমিক ধর্মঘট চলছে। এছাড়া মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া থেকে পাম অয়েল আমদানি করা হয়। এই দুটি দেশে ফেব্রুয়ারি-মার্চ থেকে পাম অয়েলের মৌসুম শুরু হবে। কিন্তু দেশ দুটি আশঙ্কা করছে এ বছর তাদের পাম অয়েলের উৎপাদন কম হবে। অপরদিকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বিরোধিতায় আমেরিকা থেকে সয়াবিন নিলেও এখন চীন তা নিচ্ছে না। চীন এ বছর আর্জেন্টিনা থেকে প্রায় দেড় কোটি টন সয়াবিন আমদানি করবে। এ কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদার তুলনায় ভোজ্যতেলের সরবরাহ কম।জানতে চাইলে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি জানান, ভোজ্যতেল আমদানিতে সরকারের রাজস্ব না কমিয়ে চার স্থানের ডিউটির পরিবর্তে এক স্থানে নেওয়ার জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে চিঠি দেওয়া হবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে। ভোজ্যতেলে তিন বা চার স্তরে যে ডিউটি, ভ্যাট, ট্যাক্স নেওয়া হয় সেটা সরকারের রাজস্ব না কমিয়ে এক জায়গা থেকে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। এতে ব্যবসায়ীদের সময় বাঁচবে, হয়রানি কমবে। পাশাপাশি সরকারেরও রাজস্ব কমবে না। ভোজ্যতেলে আগে ১৫ শতাংশ ডিউটি নেওয়া হতো একটা স্থানে। এখন চার জায়গায়। ব্যবসায়ীরা চাচ্ছে সরকারের রাজস্ব না কমিয়ে সেটা আবার এক জায়গায় নিয়ে আসতে।এদিকে বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশনের এক প্রতিবেদনে জানা গেছে, ২০১৯ সালের মাঝামাঝি প্রতিটন অপরিশোধিত সয়াবিন তেলের আমদানি মূল্য ছিল ৬৫৪ ডলার। এতে ভ্যাট দাঁড়ায় আট হাজার ৭০০ টাকা, প্রতি লিটারে ৮ টাকা ৭০ পয়সা। গত ২০ ডিসেম্বর বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত সয়াবিন তেলের দাম টনপ্রতি ৭৯৪ ডলারে উঠেছে। এ দরের ওপর নতুন বাজেটের ভ্যাট কাঠামো ও অগ্রিম কর বিবেচনায় নিলে সরকারের রাজস্ব দাঁড়াবে লিটারে ১৪ টাকা ৮৫ পয়সা, ২০১৯ সালের মে মাসের তুলনায় লিটারে প্রায় ৬ টাকা বেশি।মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমানোর বিষয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, পণ্যের হাত বদলের কারণে যেন বাজারে প্রভাব না পড়ে। বিশেষ করে, খোলা তেলের বিষয়ে। ৭০ থেকে ৭২ শতাংশ খোলা তেল, বাকিটা বোতলজাত। আরও বেশি বোতলজাত করা গেলে দামের হেরফের কম হবে। উৎপাদন পর্যায়ে ২ শতাংশ, তারপরের ধাপে ৩ শতাংশ এবং খুচরা পর্যায়ে ৭ শতাংশ লভ্যাংশের কথা আগে থেকেই ঠিক করা আছে। সেটা যদি তারা পায় তাহলে তাদের আপত্তি নেই। কমিটি বসে ঠিক করে দেবে। এসব বিষয় নিয়ে ট্যারিফ কমিশন কাজ করছে।এ প্রসঙ্গে সিটি গ্রুপের পরিচালক বিশ্বজিৎ সাহা বলেন, বিশ্ববাজারে নভেম্বরে অপরিশোধিত সয়াবিন তেলের দাম ছিল টনপ্রতি ৭১০ ডলার, এখন তা এক হাজার ডলার ছাড়িয়েছে। একইভাবে ৬০০ ডলারের পাম ওয়েল এখন ৮৫০ ডলার। এভাবে দাম বাড়লে এর প্রভাব তো বাজারে পড়বেই।দেশের ভোজ্যতেলের বাজারে চলছে ব্যবসায়ীদের রামরাজত্ব। যে যেভাবে পারছে বাড়িয়ে নিচ্ছে সয়াবিন তেলের দাম। খোলা বা বোতলজাত কোনও প্রকার ভোজ্যতেলের নামই এখন সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেই। কেউ কেউ বোতলজাত সয়াবিনের গায়ে লেখা দামের তুলনায় বাড়িয়ে নিচ্ছেন। ক্রেতারা কারণ জানতে চাইলে ব্যবসায়ীদের একমাত্র জবাব- ‘সাপ্লাই নেই, কোম্পানি আসে না’। আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই দিয়ে এখনও চলছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। ট্যারিফ কমিশনের নেতৃত্বে গঠিত কমিটি দাম সমন্বয়ের কাজ করছে। কবে নাগাদ সেই দাম আলোর মুখ দেখবে এর জবাব নেই কারও কাছে। সামনে রমজান। এমন পরিস্থিতিতে দিশেহারা সাধারণ মানুষ। তাদের প্রশ্ন—দেশের ভোজ্যতেলের বাজার কে দেখভাল করে?আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদার তুলনায় সয়াবিন ও পাম অয়েলের সরবরাহ কম—এমন অজুহাতে দেশের বাজারে প্রায় দুই মাস ধরেই ভোজ্যতেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী। ৮৮ টাকা লিটার দরের সয়াবিন তেল এখন কোথাও বিক্রি হচ্ছে ১৩০ টাকা আবার কোথাও ১১৫ টাকা। একই পণ্যের দামে এত পার্থক্যের কোনও ব্যাখ্যা কারও কাছে নেই। সরকারের বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসাবে, গত এক বছরে দেশে সয়াবিন তেলে ২৪ দশমিক ৩২ শতাংশ ও পাম অয়েলের ২২ দশমিক ৮৪ শতাংশ দাম বেড়েছে।জানা গেছে, গত ১০ বছরের মধ্যে ভোজ্যতেলের এখন সর্বোচ্চ বাজার। এক মাসের ব্যবধানে খুচরা পর্যায়ে সয়াবিন তেলের দাম বেড়েছে ৯ দশমিক ৫২ শতাংশ। আর বছর ব্যবধানে এ বৃদ্ধির হার ১২ দশমিক ২০ শতাংশ। এরইমধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির কথা বলে পণ্যটির দাম বাড়াতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ সংস্থা বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনে চিঠি দিয়েছে ভোজ্যতেল আমদানিকারক সমিতি।ভোজ্যতেল আমদানি সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে এখন সয়াবিন তেলের দাম বেশি। মিল মালিকরা এক হাজার ডলারের বেশি মূল্যে সয়াবিন আমদানিতে এলসি খুলেছেন। এতে লিটার প্রতি সয়াবিন তেলের দাম প্রায় ১৩০ টাকা পড়বে। এ কারণেই সয়াবিনের দাম বাড়ানোর আবেদন করা হয়েছে।বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলছে, ভোজ্যতেল নিয়ে সারাদেশে একটা সংকট তৈরি হয়েছে। দেশের ভোজ্যতেলের চাহিদার ৯০ শতাংশ আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর নির্ভর করে। যখন সেখানে দাম বাড়ে তখন দেশের বাজারেও তার প্রভাব পড়ে। ছয় মাস আগে প্রতিটন অপরিশোধিত সয়াবিন তেল ৭০০ ডলারে বিক্রি হলেও বর্তমানে ১১৫০ ডলারে দাঁড়িয়েছে। এতে দেখা যায়, দাম ৭৫ শতাংশ বেড়েছে। কিন্তু গত এক সপ্তাহ ধরে আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেলের দাম কমতে শুরু করেছে। তবে তা স্থিতিশীল নয়। তাই এখনই দাম কমাতে রাজি নয় দেশের ব্যবসায়ীরা।গত শুক্রবার (৫ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর খুচরা বাজারে এক লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেল কোম্পানিভেদে ১৩০ থেকে ১৪০ টাকায় টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে। আর পাঁচ লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম রাখা হচ্ছে কোম্পানিভেদে ৬২০ থেকে ৬৮০ টাকা পর্যন্ত। বাজারে প্রতি লিটার পাম সুপার ১১০ থেকে ১১৫ টাকা, পাম অয়েল ১০০ থেকে ১০২ টাকায় বিক্রি হয়। একশ্রেণির ব্যবসায়ী কারসাজি করে তাদের ইচ্ছেমতো বাজারে সয়াবিনের দাম বাড়াচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এদিকে ব্যবসায়ীরা সয়াবিনের ওপর আরোপিত আমদানি শুল্ক প্রত্যাহারের দাবি করলেও এ বিষয়ে এখনও কোনও সিদ্ধান্ত নেয়নি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড-এনবিআর। বিষয়টি নিয়ে বিব্রত সরকার। এমন পরিস্থিতিতে করণীয় নির্ধারণে গত ২৪ জানুয়ারি ভোজ্যতেল আমদানিকারকসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠক করেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি। এ বৈঠকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ, বাংলাদেশ ব্যাংক, ট্যারিফ কমিশন, বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। ওই বৈঠকে সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ সংস্থা ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের নেতৃত্বে ভোজ্যতেল আমদানিকারকসহ সংশ্লিষ্টদের নিয়ে একটি কমিটি করে দেওয়া হয়েছে। যারা আন্তর্জাতিক বাজার দরের সঙ্গে সমন্বয় করে দেশীয় বাজার দর ঠিক করবে। কিন্তু সেই কমিটি এখনও এ কাজটি সম্পন্ন করতে পারেনি।তবে এর আগে ভোজ্যতেলের বাজার সহনীয় পর্যায়ে রাখতে কয়েকটি সুপারিশ করা হয়েছিল। ট্যারিফ কমিশনের প্রথম সুপারিশে বলা হয়েছিল, সরকার উৎপাদন ও ব্যবসায়ী পর্যায়ে বিদ্যমান ভ্যাট মওকুফ করলে এবং সরবরাহ ও খুচরা পর্যায়ে কমিশনের হার লিটারপ্রতি যথাক্রমে ৩ ও ৫ টাকা নির্ধারণ করলে ভোজ্যতেলের দামে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। দ্বিতীয় সুপারিশে কমিশন বলেছে, ভোজ্যতেলের ওপর যে অগ্রিম কর রয়েছে, সেটি তুলে নিলেও বাজারে এর দামে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে এবং দাম কমবে। তৃতীয় সুপারিশে ট্যারিফ কমিশন বলেছে, আমদানি মূল্যে শতকরা হারের পরিবর্তে টনপ্রতি নির্দিষ্ট হারে ভ্যাট আরোপ করলেও সুফল পাওয়া যাবে। কমিশন আরও বলছে, আমদানিকারকদের দুই পর্যায়ে ভ্যাট অব্যাহতি, অগ্রিম কর প্রত্যাহার এবং সরবরাহ ও খুচরা পর্যায়ে কমিশন যৌক্তিক করলে সয়াবিন তেলের দাম লিটারপ্রতি ১১০ টাকার মধ্যে রাখা যাবে। এসব সুপারিশের কোনোটাই এখন পর্যন্ত গ্রহণ করেনি সরকার তথা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।ব্যবসায়ীরা বলছেন, দেশে চাহিদার ৯০ শতাংশ ভোজ্যতেল আমদানি করা হয়। আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল থেকে সবচেয়ে বেশি সয়াবিন তেল আমদানি করে। কিন্তু ব্রাজিলে সয়াবিনের উৎপাদন কম হয়েছে, আর আর্জেন্টিনায় দীর্ঘদিন ধরে ভোজ্যতেলের মিলগুলোতে শ্রমিক ধর্মঘট চলছে। এছাড়া মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া থেকে পাম অয়েল আমদানি করা হয়। এই দুটি দেশে ফেব্রুয়ারি-মার্চ থেকে পাম অয়েলের মৌসুম শুরু হবে। কিন্তু দেশ দুটি আশঙ্কা করছে এ বছর তাদের পাম অয়েলের উৎপাদন কম হবে। অপরদিকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বিরোধিতায় আমেরিকা থেকে সয়াবিন নিলেও এখন চীন তা নিচ্ছে না। চীন এ বছর আর্জেন্টিনা থেকে প্রায় দেড় কোটি টন সয়াবিন আমদানি করবে। এ কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদার তুলনায় ভোজ্যতেলের সরবরাহ কম।জানতে চাইলে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি জানান, ভোজ্যতেল আমদানিতে সরকারের রাজস্ব না কমিয়ে চার স্থানের ডিউটির পরিবর্তে এক স্থানে নেওয়ার জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে চিঠি দেওয়া হবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে। ভোজ্যতেলে তিন বা চার স্তরে যে ডিউটি, ভ্যাট, ট্যাক্স নেওয়া হয় সেটা সরকারের রাজস্ব না কমিয়ে এক জায়গা থেকে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। এতে ব্যবসায়ীদের সময় বাঁচবে, হয়রানি কমবে। পাশাপাশি সরকারেরও রাজস্ব কমবে না। ভোজ্যতেলে আগে ১৫ শতাংশ ডিউটি নেওয়া হতো একটা স্থানে। এখন চার জায়গায়। ব্যবসায়ীরা চাচ্ছে সরকারের রাজস্ব না কমিয়ে সেটা আবার এক জায়গায় নিয়ে আসতে।এদিকে বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশনের এক প্রতিবেদনে জানা গেছে, ২০১৯ সালের মাঝামাঝি প্রতিটন অপরিশোধিত সয়াবিন তেলের আমদানি মূল্য ছিল ৬৫৪ ডলার। এতে ভ্যাট দাঁড়ায় আট হাজার ৭০০ টাকা, প্রতি লিটারে ৮ টাকা ৭০ পয়সা। গত ২০ ডিসেম্বর বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত সয়াবিন তেলের দাম টনপ্রতি ৭৯৪ ডলারে উঠেছে। এ দরের ওপর নতুন বাজেটের ভ্যাট কাঠামো ও অগ্রিম কর বিবেচনায় নিলে সরকারের রাজস্ব দাঁড়াবে লিটারে ১৪ টাকা ৮৫ পয়সা, ২০১৯ সালের মে মাসের তুলনায় লিটারে প্রায় ৬ টাকা বেশি।মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমানোর বিষয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, পণ্যের হাত বদলের কারণে যেন বাজারে প্রভাব না পড়ে। বিশেষ করে, খোলা তেলের বিষয়ে। ৭০ থেকে ৭২ শতাংশ খোলা তেল, বাকিটা বোতলজাত। আরও বেশি বোতলজাত করা গেলে দামের হেরফের কম হবে। উৎপাদন পর্যায়ে ২ শতাংশ, তারপরের ধাপে ৩ শতাংশ এবং খুচরা পর্যায়ে ৭ শতাংশ লভ্যাংশের কথা আগে থেকেই ঠিক করা আছে। সেটা যদি তারা পায় তাহলে তাদের আপত্তি নেই। কমিটি বসে ঠিক করে দেবে। এসব বিষয় নিয়ে ট্যারিফ কমিশন কাজ করছে।এ প্রসঙ্গে সিটি গ্রুপের পরিচালক বিশ্বজিৎ সাহা বলেন, বিশ্ববাজারে নভেম্বরে অপরিশোধিত সয়াবিন তেলের দাম ছিল টনপ্রতি ৭১০ ডলার, এখন তা এক হাজার ডলার ছাড়িয়েছে। একইভাবে ৬০০ ডলারের পাম ওয়েল এখন ৮৫০ ডলার। এভাবে দাম বাড়লে এর প্রভাব তো বাজারে পড়বেই।

Leave a Reply

     এই বিভাগের আরও খবর