আজ ৯ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ২৪শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

শাহানুর রহমান উজ্জ্বল-এর কাব্যের শেষ ঠিকানা প্রকৃতির কাছে সমর্পণ

জাহাঙ্গীর আলম কবীর

শাহানুর রহমান উজ্জ্বল-এর কবিতা বই ‘স্বয়ং বরং’-এর কাব্য ভাবনা লিখতে গিয়ে প্রথমেই দু’একটা কথা না বলে আলোচনায় যেতে মন চাইছে না। কেননা, তার সাথে পরিচয় পর্বটা জানা জরুরি। শাহানুর রহমান উজ্জ্বল সাংবাদিক, পাশাপাশি কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক ছড়া ও গান লিখে থাকেন। বইটির উপক্রমণিকা থেকে জেনেছি তার প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ৬টি। ‘স্বয়ং বরং’ তার সর্বশেষ প্রকাশিত কবিতার বই।
দিনটি ছিল শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২০। জরুরি প্রয়োজনে অন্যের সফরসঙ্গী হয়েছিলাম। সাতক্ষীরা থেকে রওনা দিয়ে যশোরের চৌগাছায় পৌছেছিলাম ভর-দুপুরে। শুধু মাত্র শাহানুর রহমান উজ্জ্বল-এর সাহায্য কামনায়, তার সাথে দেখা করার জন্য। তার মোবাইল নম্বর আগেই সংগ্রহ করেছিলাম যশোরের সাংবাদিক ছোট ভাই সমতুল্য নূর ইসলাম-এর কাছ থেকে। তার কাছ থেকে জেনেছি শাহানুর রহমান উজ্জ্বল-এর বহুমুখি প্রতিভা ও কর্মকান্ড সম্পর্কে। চৌগাছায় পৌছে তার কাছে ফোন দিয়ে অনেকটাই হতাশ হয়েছিলাম। মোবাইলে রিং হয়, উত্তর নেই। অবশেষে ফিরতি রিংয়ে হালে পানি পেলাম। দেখা হলো দুপুর ১টার দিকে। চৌগাছা প্রেস ক্লাবে বসে প্রয়োজনীয় কথা সেরে উঠেছি। তখন হাতে দিলেন ‘স্বয়ং বরং’। সেই কবিতার বই নিয়েই আজ লিখতে বসেছি।
‘স্বয়ং বর’-এ প্রকাশিত হয়েছে ৪২টি কবিতা। এই বইয়ের কবিতাগুলো রচিত ভিন্ন ভিন্ন স্বাদে। এর তেকে মাত্র গুটিকয়েক কবিতা দিয়ে বুঝতে চেষ্টা করেছি শাহানুর রহমান উজ্জ্বল-এর কবি-চিন্তার দর্শণ। কবিতার আলোচনা বরতে যা বুঝায় তা এখানে অনুপস্থিত। কবিতার ছন্দ বিন্যাস, শব্দ চয়ন, উপমা, অলঙ্কার, গঠনশৈলী, অন্যান্য উপদান এই আলোচনায় একেবারেই নেই।
যে কবিতার নামকরণে বইটির নামকরণ করা হয়েছে ‘স্বয়ং বরং’ তাতে কবি প্রথম দু’চরণে লিখেছেন:
বিরক্তি বরণে প্রেম সংকট
আরক্তি লাগে উদ্ভট।
… … … … … … … …
অহং রংকরা মূল্যহীন ভাব-
স্বয়ং বরং ভালো নিজস্ব স্বভাব।
(কবিতা: স্বয়ং বরং)
অর্থাৎ, এখন প্রেমে চলছে সংকট। মানুষের কথাবার্তায় রয়েছে ছলচাতুরি। আর মানুষের যে অহংকার সেটাও রং করা, মিথ্যার আশ্রয়। সবকিছুতেই মাত্রারিক্ত বাড়াবাড়ি। যা অশোভন, অসার। তাই তিনি লিখেছেন:
সাধের স্বপ্নরা দেখি বেহুদা বাতাস-
ক্ষার বৃষ্টিতে মন শূন্য আকাশ।
বিবর্ণ হৃদয় থাকে কাল নির্বাক-
ক্ষণ ক্ষত বিক্ষত কবি যে অবাক।
(কবিতা: ক্ষণ ক্ষত)
এখানেই তার কষ্ট ও দুঃখ বোধের শেষ নয়। দেখেছেন:
খোলা মনে কেউ তো আর হাসে না
উবে গেছে দুরন্ততা কাল-
মায়া মমতায় দেখি পড়ে ভাটা
নেই, সেই স্নিগ্ধ পরম সকাল।
(কবিতা: উবে গেছে সব)
দেখেছেন:
বিশাল ব্যস্ততায় দেখি মানুষ একা-
প্রেমিকেরও নিতে হয় এপয়েন্টমেন্ট।
(কবিতা: উবে গেছে সব)
তার লেখনিতে উঠে এসেছে মানুষের হিংস্র স্বভাব। মানুষ অমানুষ হয়ে উঠেছে। বলেছেন:
কতকাল সত্যরা হয় বন্দি
কতকাল মানুষ এঁটেছে ফন্দি
কতকাল ক্ষয়ে, অকল্যাণে সন্ধি,
ক্রমাগত মানুষ লোভাতুর দৃষ্টিতে নেকড়ে।
(কবিতা: ক্রমাগত মানুষ নেকড়ে)
কবি শাহানুর রহমান উজ্জ্বল দিব্যচোখে দেখতে পেয়েছেন সমাজের অসঙ্গতি, অনাচার ও অসভ্যতা। যেন আবার ফিরে আসছে আওয়ামে জাহেলিয়ার যুগ। ফিরছে ভিন্ন মাত্রায়। তাই প্রশ্ন করেছেন:
আমার মনে প্রশ্নজাগে সভ্য সমাজ ঠিক কিনা?
সভ্য হয়েও অসভ্যতে অমানবিক জ্ঞানকানা।
(কবিতা: ভেদভুলে দাও ঝলক হাসি)
নিজের কাছে তার আরও প্রশ্ন:
আমি কতটা রঙ রঙ ভালোবাসি-
আমি কতটা সৌন্দর্যকে ভালোবাসি
আমি কতটা ভাবনার গভীরের মানুষ।
(কবিতা: শব্দ সুন্দরের পূজারি)
আবার বলেন:
আমার বোধের উনুন জ¦লে ওঠে দেখো-
চেতনার সুগভীরে ভাবনা রাখো।
(কবিতা: শব্দ সুন্দরের পূজারি)
মানুষ এতুই যান্ত্রিক হয়ে যাচ্ছে যে প্রেমিক প্রেমিকার কাছে, প্রেমিকার প্রেমিকের কাছে আগাম দর্শণের অনুমতি নিতে হয়। মানতে হয় তাদের দেয়া সময়ের ফ্রেম। মানতে হয় ঘড়ির কাটার চোখ রাঙানি। এই যান্ত্রিকতার যুগে মানুষ দিন দিন অসহায় হয়ে উঠছে। তাই তো বলতে দেখি:
এখানে দুঃখরা আত্মহত্যা করেছে, ভালোবাসা এখন অসাড়, মৃত।
(কবিতা: সাহসের অভিযাত্রার নাম স্বাধীনতা)
তার দুঃখ বোধের ভেতর থেকে উৎসারিত হয়:
যতুই দ্রুত প্রস্থান নিবি, ততই পৃথিবীর মঙ্গল বৈকি।
কেননা, তুই ছিলি স্বপ্নের সম্পদ, এখন শুধু মৃতসম জঞ্জাল।
(কবিতা: এখন শুধুু মৃতসম জঞ্জাল)
তাই তো লিখতে পেরেছেন:
আমাকে সেই সুধাই দাও মানবিকবোধে-
অন্যকে সুখি রাখতে নিজেকেই যেন অনলে পুড়তে পারি।
(কবিতা: আমি বুঁদ হতে চাই না)
আবার নিজের প্রশান্তি খুঁজেছেন গ্রাম্য সরলতায়। ফিরে গেছেন তার সেই নিজ গ্রাম নাড়ীপোতা গ্রামে। তার নিজেকে দু’দন্ড শান্তি পেতে পারে তার গ্রাম ও প্রকৃতি। তাই তার লেখনিতে ঠেলাঠেলি করে ভিড় জমিয়েছে: ভাঙা ঘর, চৌচির উঠান, খড়ের চাল, কোকিলের ভাঙাস্বর, টুনটুনির বাসা, জাম গাছে ভীমরুল, খেজুরের রস, খোলা আকাশ, দিগন্ত জোড়া মাঠ। আর:
ধানের গোলা ঢেঁকিপাতা ছবি কত মনোহর
ফসলি মাঠ গরুর গোয়াল মুগ্ধময় গ্রাম্যঘর।
পুকুরে স্নান সরল অভিমান- মুক্তিনগর।
সর্পলেজ ছোট সড়ক সারিসারি বাগান বহর।
(কবিতা: নাড়ীপোতা গ্রামের টানে)
শাহানুর রহমান উজ্জ্বল প্রমাণ করেছেন চরম অসহায় হলে মানুষ অবশেষে প্রকৃতির কাছে আশ্রয় নেয়। আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। আর তার মনে হয়:
আমি কে, আমে কেমন?
স্বভাব যেমন ঠিক তেমন।
(কবিতা: আমি কে)
 [‘স্বয়ং বরং’ প্্রথম প্রকাশ: অমর একুশে গ্রন্থ মেলা ২০২০, প্রচ্ছদ এঁকেছেন আতিয়ার রহমান আতিক, প্রকাশক: আহসান আল আজাদ, বাংলার প্রকাশন, ক্ষণিকা, ৫৮৪ (৬ষ্ঠ তলা), পশ্চিম নাখাল পাড়া, তেজগাঁও, ঢাকা- ১২১৫, মুঠোফোন: ০১৯৭৭ ৭৫৩ ৭৫৩। অনলাইন পরিবেশক: ফোনে অর্ডার করতে: ০১৫১৯ ৫২১ ৯৭১, দাম: ১৮০.০০ টাকা]

Leave a Reply

     এই বিভাগের আরও খবর